
মোংলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো আগামীকাল ২২ অক্টোবর মোংলা সমুদ্রবন্দর পরিদর্শনে যাচ্ছেন তারেক রহমান। তাঁর এই সফরকে ঘিরে বাগেরহাটের মোংলা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রশাসনিক তৎপরতা বেড়েছে। বন্দর ব্যবহারকারী, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা আশা করছেন, এই সফরের মাধ্যমে বন্দরের নাব্যতা সংকট, নতুন জেটি নির্মাণ, যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং শিল্পায়নের বাধা দূর করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মোংলা সমুদ্রবন্দর পরিদর্শনকে ঘিরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর হিসেবে পরিচিত মোংলাকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বন্দর ব্যবহারকারীরা। তাঁদের মতে, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, নৌপথের নাব্যতা নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা গেলে এ বন্দরের বাণিজ্যিক সক্ষমতা আরও বাড়বে।
আগামীকাল ২২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর এই সফর উপলক্ষে মোংলা ও আশপাশের এলাকায় প্রশাসনিক প্রস্তুতি চলছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যেও উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। তবে সফরটি মূলত সরকারি, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম পর্যালোচনাকেন্দ্রিক। এতে কোনো দলীয় জনসভার কর্মসূচি রাখা হয়নি বলে স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন।পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ পরিদুল ইসলাম জানান, সফরকালে প্রধানমন্ত্রী মোংলা বন্দরের বর্তমান সক্ষমতা, জেটি এলাকা এবং চলমান ও প্রস্তাবিত বড় প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি সরেজমিনে পর্যালোচনা করবেন।প্রধানমন্ত্রীর সফরে চীনের সহায়তায় মোংলা বন্দরে নতুন জেটি নির্মাণের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।
এ প্রকল্পের জন্য চীন সরকারের সঙ্গে আগে চুক্তি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।এ ছাড়া মোংলা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) এবং বন্দরের আশপাশে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্পায়নের গতি বাড়ানোর পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরা হবে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নতুন বিনিয়োগ আসবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে।
সফরসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টারে মোংলা বন্দর চ্যানেল, হিরণ পয়েন্ট এবং সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকা পরিদর্শন করবেন। বন্দরের সাগর মোহনার আকরাম পয়েন্টে প্রস্তাবিত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) স্থাপনের স্থানও পরিদর্শনের কথা রয়েছে। এরপর তিনি নলিয়ানে যাবেন। পরে নৌপথে মোংলা নৌবাহিনীর এলাকায় গিয়ে বিকেলে বন্দরের জেটি এলাকা পরিদর্শন করবেন। এরপর তাঁর অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শনের কর্মসূচি রয়েছে।মোংলা নদীর ওপর বহুল প্রত্যাশিত সেতু নির্মাণ এবং মোংলা-খুলনা মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার প্রস্তাবও প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। বন্দর উন্নয়নের পাশাপাশি এসব যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন হলে পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, মোংলা বন্দরকে চট্টগ্রাম বন্দরের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং সমকক্ষ ও পরিপূরক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ জন্য বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সড়ক ও রেলপথে পণ্য পরিবহনের সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।বন্দর ব্যবহারকারীদের অভিযোগ, চ্যানেলে পর্যাপ্ত নাব্যতা না থাকায় বড় আকারের বিদেশি জাহাজ সব সময় সরাসরি জেটিতে ভিড়তে পারে না। এতে পণ্য পরিবহন ও খালাসের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সময় ও ব্যয় বাড়ে।তাঁদের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রী নতুন জেটি নির্মাণের স্থান পরিদর্শনের পাশাপাশি বন্দর চ্যানেলের গভীরতা বাড়াতে কার্যকর ও স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশনা দেবেন।
একই সঙ্গে মোংলা ইপিজেড ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।ব্যবসায়ীদের মতে, বন্দর থেকে খালাস করা পণ্য দ্রুত ও কম খরচে দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছাতে সড়ক ও রেল যোগাযোগের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি জেটিতে জাহাজ আগমনের সংখ্যা বাড়াতে সেবার মান উন্নয়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে।কয়েকজন বন্দর ব্যবহারকারী আরও অভিযোগ করেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে বন্দরের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। তাঁদের ভাষ্য, শুধু ড্রেজিং বা খননকাজ করলেই হবে না; বন্দরের পরিচালনব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতাগুলোও দূর করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে বাগেরহাট জেলা ও মোংলা উপজেলায় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরাতে এই সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মোংলা বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন বিনিয়োগ এবং যোগাযোগব্যবস্থার সম্প্রসারণ করা গেলে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনে নতুন সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে ট্রানজিট সুবিধার ব্যবহার এবং সুন্দরবনকেন্দ্রিক পরিবেশবান্ধব পর্যটন বিকাশেও সম্ভাবনা বাড়তে পারে।তবে এসব প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ দিতে পরিকল্পিত উন্নয়ন, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা জরুরি। এখন স্থানীয় ব্যবসায়ী, বন্দর ব্যবহারকারী ও বাসিন্দাদের নজর প্রধানমন্ত্রীর ২২ অক্টোবরের সফরের দিকে। তাঁরা আশা করছেন, এই পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে মোংলা বন্দরের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানের পথে অগ্রগতি হবে।